জন্মশতবার্ষিকী
‘বাংলার গোর্কি’ শওকত ওসমান

শওকত ওসমান একবার দাবি করেছিলেন, তিনি লেখক নন, তিনি মূলত ‘ঝাড়ুদার’। সমাজে জমানো জঞ্জাল তিনি আমৃত্যু ঝাড়ু দিয়ে সাফ করে যাবেন লেখার মাধ্যমে। তাঁর রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল এমনই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-ঠাট্টা, ইয়ার্কি, উপহাস। এটাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন অস্ত্র হিসেবে। সমাজের ক্লাউনদের, হিপোক্রেটদের, মৌলবাদী দৈত্যদের বুকে তিনি নিক্ষেপ করতেন এই অস্ত্র। বাস্তবিক অর্থে ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা নামের শত্রু সারা জীবন ধাওয়া করেছে তাঁকে। শুধু জীবনধারণের জন্য শৈশবে, কৈশোরে আর প্রথম জীবনে তাঁকে লড়াই করতে হয়েছিল দুঃসহ পরিবেশের সঙ্গে। এরই মধ্যে পড়ার খরচ জোগাড় করতে হয়েছে নিজেকেই। মা তাঁর একমাত্র গয়না ছেলের হাতে তুলে দিয়েছেন বিক্রি করে পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তাঁর এই অসচ্ছলতার কথা কাউকে কখনো বুঝতে দেননি তিনি। কড়া ইস্ত্রি করা কেতাদুরস্ত পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতেন তিনি সব সময়। দেখে কেউ বুঝতেই পারতেন না যে ওই একটি-দুটি কাপড়ই তাঁর সম্বল। সেগুলো তিনি নিজে ধুয়ে শুকাতেন রোজ। পরে তাঁর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের লন্ড্রিতে ইস্ত্রি করে নিতেন নিজেই। এত কষ্টের মধ্যে থেকেও কারো কাছে সাহায্য চাননি, মাথা নোয়াননি।
পরিবেশ, মানুষ এবং জীবন- কেউ হারাতে পারেনি শওকত ওসমানকে। তিনি চিরদিন মাথা উঁচু করেই থেকেছেন। সম্পূর্ণ নিজ প্রতিভায় তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের অন্যতম একজন লেখক। প্রতিভা ও সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন গল্প, উপন্যাস, নাটক, মননশীল নিবন্ধ, রাজনৈতিক প্রবন্ধসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়।
১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলির খানাকুল থানার সবল সিংহপুর গ্রামে শওকত ওসমানের জন্ম। প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান। তবে ছদ্মনাম শওকত ওসমান নামেই তিনি সর্বত্র খ্যাত। বাবা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া এবং মা গুলজান বেগম। বাবা ছিলেন সামান্য একজন কৃষক। ঘোর দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে শওকত ওসমানের কৈশোর জীবন- সে কথা আগেই বলা হয়েছে। সবল সিংহপুর গ্রামের মক্তবে পাঁচ বছর বয়সে তাঁর শুরু হয় শিক্ষাজীবন। বছর দেড়েক পড়েছিলেন নন্দনপুর রূপচাঁদগুপ্ত একাডেমিতে। এরপর পড়াশোনা করেন গ্রামের জুনিয়র মাদ্রাসায়। ১৯৩৩ সালের কলকাতা মাসাসা-এ-আলিয়ার ইংরেজি শাখা থেকে প্রথম বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হন প্রবেশিকা পরীক্ষায়।
মাদ্রাসায় পড়ার সময়ই টিউশনি করে সংসারে টাকা পাঠাতেন শওকত ওসমান। ছোটবেলা থেকেই তিনি অর্থনৈতিকভাবে গড়ে তুলেছিলেন নিজেকে। তাঁর রচিত ‘স্বগ্রাম স্বজন’ বইতে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন বাল্যকালের দারিদ্র্য। ১৯৩৪ সালে তিনি ভর্তি হন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। তখনো টিউশনি করেন তিনি। ১৯৩৬ সালে ওই কলেজ থেকেই প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে। হঠাৎ কী মনে করে অনার্স ত্যাগ করে পড়তে শুরু করেন পাসকোর্সে। ১৯৩৯ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়ে লাভ করেন এমএ ডিগ্রি। স্নাতকোত্তর পাস করার পর ১৯৪১ সালেই কলকাতা করপোরেশনে ৮০ টাকা বেতনে পাম্ফলেট রাইটারের চাকরি নেন শওকত ওসমান। একই বছর তিনি কমার্শিয়াল কলেজে ১২৫ টাকা বেতনে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের প্রভাষক হিসেবে। এরপর ১৯৫৮ সালে চলে আসেন ঢাকা কলেজে। ১৯৭০ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭২ সালের ১ এপ্রিল অবসর নেন।
১৯৩৮ সালে ছাত্রজীবনেই পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার কাওসার আলীর মেয়ে সালেহা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শওকত ওসমান। এই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। রবীন্দ্র-নজরুলের মতো শওকত ওসমানেরও একটি ছেলে মারা যায় অকালে। নাম ছিল তার তুরহান ওসমান। অন্য সন্তানরা হলেন বুলবন ওসমান, আশফাক ওসমান, ইয়াফেস ওসমান ও জানেসার ওসমান এবং মেয়ে আনফিসা আসগর।
আশি বছরের আয়ুরেখায় দাঁড়িয়ে একটি দৈনিকে নিয়মিত পদ্য লিখতেন তিনি ‘শেখের সম্বর’ নামে। তাতে তিনি আঘাত করেছেন সমকালের হিংস্র মৌলবাদীদের। কবিখ্যাতি পাওয়ার লোভে নয়, বরং তিনি পদ্য লিখতেন বিদ্রূপ ঝলসানো তরবারি রূপে-মৌলবাদ সর্বস্ব অচলায়তন সমাজকে বিদ্ধ করার জন্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং এ দেশের রাজাকার-আলবদররা যে হত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগের মতো নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছে সে ইতিহাস শওকত ওসমান তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়। একইভাবে জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে লাখ লাখ দেশপ্রেমিক যেভাবে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, সেই চিত্রও তিনি এঁকেছেন নিপুণ শৈল্পিক দক্ষতায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর কলকাতায় প্রায় পাঁচ বছরের জন্য স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন তিনি। এটি ছিল তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
শওকত ওসমান শতাধিক গ্রন্থের স্রষ্টা। তাঁকে খ্যাতির শিখরে অধিষ্ঠিত করেছে ‘জননী’ ও ‘ক্রীতদাসের হাসি’। তবে গৃহকোণে বসে থেকে তিনি শুধু সাহিত্য সাধনা করে যাননি। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে লেখনী ছাড়াও তিনি রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছেন। জীবনের শেষের দিকে তিনি ঝুঁকে পড়েন রাজনীতির প্রতি। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতেন। শ্রমিকদের বিজয়ী রাষ্ট্র হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা। তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে তিনি বড় কষ্ট পান। দরিদ্র শ্রমিকদের প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা। তিনি বলতেন, বাংলা সাহিত্যের তিনি একজন খাদেম মাত্র অর্থাৎ শ্রমিক। আর সে কারণেই সাংবাদিক-সাহিত্যিক সন্তোষ গুপ্ত তাঁকে আখ্যায়িত করেছিলেন বাংলার ‘গোর্কি’ হিসেবে। কারণ ম্যাক্সিম গোর্কি ও শওকত ওসমান দুজনের লেখাতেই প্রাধান্য পেয়েছে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জীবনের বর্ণনা।
জীবনের একেবারে শেষদিকে শওকত ওসমান লেখা শুরু করেন আত্মজীবনী ‘রাহনামা’। এটি শেষ করার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত জেগে লিখতেন তিনি। তবে ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ তিনি হঠাৎই সেরিব্রাল অ্যাটাকে পড়েন। এর ফলে তিনি একেবারেই হারিয়ে ফেললেন তাঁর লেখালেখির ক্ষমতা। ফলে ‘রাহানামা’ রচনা অসমাপ্ত থেকে যায়। আর এই অসুখের সঙ্গে লড়াই করে ১৯৯৮ সালের ১৪ মে সকালে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন সাহিত্যের এই মহান কারিগর।